পরশুরাম

পরশুরাম: মাতৃহত্যা পাপে অভিশপ্ত হয়েও যিনি ছিলেন অবতার

নির্বাচিত পোস্ট মিথলজি
বিভিন্ন পুরাণ ও মহাকাব্যে অমরত্বের কথা শুনা যায়। হিন্দু পুরাণও এর ব্যতিক্রম নয়। হিন্দু পুরাণে যে কজন অমরত্বের অধিকারী তাদের মধ্যে সবচেয়ে আকর্ষণীয় ও বৈচিত্রময় চরিত্র হলেন পরশুরাম। পরশুরাম এমনই একটি চরিত্র, যিনি রামায়ণ এবং মহাভারত— দুই মহাকাব্যেই উপস্থিত। তার বাইরে বিবিধ পুরাণেও পরশুরামকে খুঁজে পাওয়া যায়।
হিন্দু পৌরাণিক মতে ত্রেতা যুগে আবির্ভুত বিষ্ণুর তিন অবতারের মধ্যে পরশুরাম ছিলেন দ্বিতীয় এবং বিষ্ণুর দশ অবতারের মধ্যে ষষ্ঠ।
উদ্ধত ক্ষত্রিয়দের হাত থেকে ব্রাহ্মণদের রক্ষা করার জন্য বিষ্ণু পরশুরাম হিসাবে পৃথিবীতে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। কথিত আছে, তিনি সমুদ্রের আগ্রাসন থেকে কোঙ্কণ ও মালাবার অঞ্চলকে রক্ষা করেছিলেন। এই কারণে কেরল ও কোঙ্কণ উপকূলীয় অঞ্চলকে পরশুরাম ক্ষেত্র বলা হয়। বর্তমান বাংলাদেশ বগুড়া জেলার শিবগঞ্জ উপজেলায় অবস্থিত মহাস্থানগড়, ভগবান শ্রী পরশুরামের রাজ্যে ছিল বলে জানা যায়। ভৃগু বংশে জন্ম বলে ইনি ভার্গব নামে পরিচিতি লাভ করেন। তিনি ত্রেতা এবং দ্বাপর যুগে বর্তমান ছিলেন।

জন্ম কাহিনী

পরশুরামের জন্ম নিয়ে নানা কাহিনী প্রচলিত রয়েছে। ভাগবত পুরাণ অনুসারে, একসময় সমাজে ক্ষত্রিয় রাজাদের প্রভাব-প্রতিপত্তি মারাত্নকভাবে বৃদ্ধি পেতে থাকে। তাদের অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে সাধারন মানুষ নিজেদের উদ্ধারকল্পে ব্রহ্মা ও বিষ্ণুর স্তব করতে শুরু করে। তখন সবার আরাধনায় সাড়া দিয়ে ক্ষত্রিয়দের শায়েস্তা করতে ব্রহ্মা ও বিষ্ণুর বরে পরশুরাম জন্মগ্রহণ করেন। আরেক মতবাদ অনুসারে, পৃথিবী স্বয়ং একটি গাভীর রূপ ধারণ করে বিষ্ণুর কাছে নিজের দুঃখ-দুর্দশার কথা জানিয়েছিলেন। তখন বিষ্ণু পরশুরাম হয়ে জন্মগ্রহণ করে এই দুঃখ-দুর্দশা দূর করবেন বলে পৃথিবীকে কথা দেন।
ঋষি জমদগ্নি ও তার রাজবংশীয় পরমাসুন্দরী স্ত্রী রেণুকার পাঁচ সন্তানের মধ্যে পরশুরাম ছিলেন কনিষ্ঠ । পরশুরামের পিতা জমদগ্নি ব্রাহ্মণ হলেও, মা রেণুকা ছিলেন ক্ষত্রিয়। তাই পরশুরাম ছিলেন ব্রহ্মক্ষত্রিয়। তিনিই ছিলেন প্রথম যোদ্ধা ঋষি। তার মা অযোধ্যার সূর্যবংশের সন্তান ছিলেন। উল্লেখ্য, এই বংশেই রামচন্দ্রের জন্ম হয়।
যাইহোক, জন্মের পর পিতা মহর্ষি জমদগ্নির আশ্রমে তার সব সন্তানরা যখন বেদ-বেদান্ত চর্চায় নিয়োজিত থাকতেন, পরশুরাম তখন তাতে কোনো উৎসাহ বোধ করতেন না। বরং তীর-ধনুক চালনার কৌশল শিখতেই তিনি বেশি উৎসাহ দেখাতেন। এদিকে জন্মের পর থেকেই পরশুরাম জেনে এসেছেন যে ক্ষত্রিয়দের শায়েস্তা করার উদ্দেশ্যেই তার জন্ম। এ অহংবোধে তাই অল্প বয়স থেকেই তিনি হয়ে উঠেন দাম্ভিক, রাগী ও প্রতিহিংসাপরায়ণ। কিছুকাল পর তিনি দেবতাদের কাছ থেকে অস্ত্র প্রাপ্তির উদ্দেশ্যে কঠোর তপস্যা শুরু করেন। এবং তপস্যায় সন্তুষ্ট করে তিনি ব্রহ্মার কাছ বেশ কয়েকটি মারণাস্ত্র আদায়ও করে নেন।
এছাড়াও মহাদেবকে তুষ্ট করে তিনি তার পরশু অর্থাৎ কুঠার অস্ত্রটি লাভ করেন। সেই থেকে তার নাম হয় পরশুরাম। মহাদেবের নির্দেশে এ অস্ত্র দিয়ে তিনি বহু অসুর নিধন করেছিলেন। এভাবে ধীরে ধীরে তিনি হয়ে উঠেন পরাক্রমশালী এক যোদ্ধা। আর যারা রাজ্য পরিচালনা ও যুদ্ধের কাজে নিয়োজিত থাকতেন তাদের সে যুগে ক্ষত্রিয় বলা হতো। তাই পরশুরাম ব্রাহ্মণ ঘরে জন্মগ্রহণ করলেও কর্মে তিনি হয়েছিলেন ক্ষত্রিয়।

মাতৃহত্যা পাপে অভিশপ্ত পরশুরাম

একদিন ঋষি জমদগ্নি যজ্ঞের আয়োজনে ব্যস্ত সময় পার করছিলেন। সে সময় তার স্ত্রী রেণুকা জল আনতে গিয়েছিলেন প্বার্শবর্তী নদীতে। একই সময় সেই নদীতে চিত্ররথ নামক এক রাজা তার স্ত্রীদের সাথে জলবিহার করছিলেন। এই দৃশ্য দেখে রেণুকা কামার্তা হয়ে পড়েন ও নিজের পূর্ব-রাজকীয় জীবন সম্পর্কে স্মৃতিবিষ্ট হন। এদিকে ঋষি জমদগ্নি বহুক্ষণ ধরে তার স্ত্রীর গৃহে ফেরার অপেক্ষা করছিলেন। রেণুকা তখনও কুটিরে ফিরে না আসায় চিন্তিত ঋষি ধ্যানযোগে স্ত্রীর ওই অবস্থা দেখে অত্যন্ত ক্রুদ্ধ হন। তিনি তৎক্ষণাৎ পুত্রদেরকে মাতৃহত্যার আদেশ দেন । কিন্তু মাতৃহত্যা যে মহাপাপ। এ জন্য ঋষি জমদগ্নি-র প্রথম চার সন্তানই পিতার এ আদেশ পালন করতে রাজি হননি। তখন ঋষি তার চার সন্তানকে জড়ত্বের অভিশাপ দেন। শেষে ঋষি তার কনিষ্ঠ সন্তান পরশুরামকে একই আদেশ দিলে পরশুরাম তার কুঠার দিয়ে মায়ের শিরশ্ছেদ করে বসেন।
পিতৃ আজ্ঞা পালন করায় জমদগ্নি পুত্রের উপর বেশ সন্তুষ্ট হলেন। তারপর ঋষি জমদগ্নি পরশুরামকে যেকোনো বর চাইতে বললেন। পরশুরাম তখন একইসাথে মায়ের পুনর্জন্ম, ভাইদের জড়ত্বমুক্তি, নিজের দীর্ঘায়ু ও অজেয়ত্বের বর প্রার্থনা করেন। এর মধ্যে স্ত্রী ও সন্তানদের প্রতি ঋষির ক্রোধও কিছুটা প্রশমিত হওয়ায় জমদগ্নি পরশুরামের সবগুলো প্রার্থনাই পূর্ণ করলেন।
কিন্তু পরশুরামের হাতে ঐ কুঠারটি লেগেই থাকল। পিতার কাছে এর কারণ জানতে চাইলে পিতা বলেন, ‘তুমি মাতৃহত্যা আর নারীহত্যা এই দ্বিবিধ পাপেই আক্রান্ত হয়েছো। আর জেনে রেখো, পাপ ছোট বা বড় যা-ই হোক না কেন কৃতকর্মীকে তা স্পর্শ করবেই।’ এভাবে মাতৃহত্যাজনিত পাপে নিজ হাতের কুঠার হাতের সাথে সংযুক্ত হয়ে যায়।

পাপ মোচন ও লাঙ্গলবন্দের তীর্থস্থান

পরিত্রাণের উপায় জানতে চাইলে পিতা জমদগ্নি পুত্রকে আশ্বস্ত করে তীর্থ পরিভ্রমণের উপদেশ দিয়ে বলেন, ‘যে তীর্থ গমনে বা স্নানে তোমার হাতের কুঠার স্খলিত হবে, জানবে যে ঐ পুণ্যস্থানই পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ তীর্থক্ষেত্র।’ পিতৃ আজ্ঞায় পরশুরাম তীর্থ পরিভ্রমণে বের হয়ে তীর্থ ভ্রমণ করতে লাগলেন। বহু তীর্থ ভ্রমণ করার পর একদিন ব্রহ্মকুণ্ডে স্নান করার সাথে সাথে তাঁর হাতের কুঠার স্খলিত হয়ে যায় এবং তিনি সর্বপাপ থেকে মুক্তিলাভ করেন। তিথিটি ছিল চৈত্র মাসের শুক্লা অষ্টমী তিথি, বুধবার ও পুনর্বসু নক্ষত্র। পরে পরশুরাম মানবকল্যাণের কথা ভেবে সিদ্ধান্ত নেন, এমন সুমহান পুণ্যময় জলকে সকলের সহজলভ্য করার জন্য এর ধারা পৃথিবীতে নিয়ে আসবেন। তারপর ব্রহ্মকুণ্ডের জলধারাকে এ পৃথিবীতে নিয়ে আসার জন্য পরশুরাম হাত থেকে স্খলিত কুঠার দিয়ে ব্রহ্মকুণ্ডের জলধারাকে হিমালয়ের পাদদেশ পর্যন্ত আনতে সক্ষম হন। তারপর লাঙ্গল দিয়ে মাটি কর্ষণ করে হিমালয়ের পাদদেশ থেকে বাংলাদেশের নারায়ণগঞ্জ জেলার ‘লাঙ্গলবন্দ’ পর্যন্ত নিয়ে আসেন। সুদূর হিমালয় থেকে একাদিক্রমে হাল চালনায় ক্লান্ত হয়ে বিশ্রাম করার জন্য তিনি যেখানে লাঙ্গল বন্ধ রেখেছিলেন সে স্থানটির নাম হয় ‘লাঙ্গলবন্দ’। এর পর থেকে ব্রহ্মপুত্র নদের লাঙ্গলবন্দ তীর্থস্থান হিসেবে পরিচিতি পায়। সনাতন হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা পাপ মোচনের বাসনায় প্রতিবছর চৈত্র মাসের অষ্টমী তিথিতে এখানে স্নান করেন।

ক্ষত্রিয়দের পরম শত্রু হয়ে ওঠার কারণ

ক্ষত্রিয়দের সম্পর্কে জানতে হলে সে সময়ের সমাজব্যবস্থা সম্পর্কে একটু ধারণা দরকার। তৎকালীন সমাজে ব্যক্তির কর্মের ভিত্তিতে তার বর্ণ নির্ধারিত হতো। যারা রাজ্য পরিচালনা ও যুদ্ধের কাজে নিয়োজিত থাকতেন, তারাই ক্ষত্রিয় বলে বিবেচিত হতেন।
সেই পুরাকালে কার্তবীর্য নামে এক ক্ষত্রিয় রাজা ছিলেন। তার আসল নাম ছিল কার্তবীর্যার্জুন। একবার তিনি পুত্রদের নিয়ে মহর্ষি জমদগ্নির আশ্রম দর্শনে আসেন। সেখানে আশ্রমে থাকা কামধেনু গাভীকে দেখে তিনি এতটাই মুগ্ধ হয়ে যান যে, রাতের আঁধারে সেই কামধেনু চুরি করে রাজা তার রাজ্যে নিয়ে আসেন। বিষয়টি জানতে পেরে পরশুরাম রাজাকে হত্যা করে সেই কামধেনুটি আশ্রমে ফিরিয়ে আনেন। এদিকে কার্তবীর্যের পুত্ররা প্রতিশোধ নিতে রাতের আঁধারে জমদগ্নির আশ্রমে হানা দেয়। এরপর ধ্যানরত জমদগ্নিকে তারা নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করেন। পরে আশ্রম কুটিরে পিতার বীভৎস মরদেহ দেখে ক্ষুব্ধ পরশুরাম একাই কার্তবীর্যের সব পুত্রকে বধ করেন। পরবর্তীকালে তিনি ক্ষত্রিয়দের উপর এতটাই প্রতিশোধপরায়ণ হয়ে পড়েন যে একুশবার তিনি পৃথিবীকে ক্ষত্রিয়শূন্য করেন।

 

পরশুরাম একুশবার পৃথিবীকে ক্ষত্রিয়শূন্য করেন

পরশুরাম একুশবার পৃথিবীকে ক্ষত্রিয়শূন্য করেন। Image Source: medium.com

যাইহোক, ক্ষত্রিয়দের হত্যা করে তাদের রক্ত দিয়ে পরশুরাম পাঁচটি হ্রদ তৈরি করেন। পরে সেই হ্রদের রক্ত পিতৃলোকের অর্পণ করেছিলেন। কিন্তু তারপর তার ভীষণ অনুশোচনা হয়। এরপর ঋচীক প্রভৃতি পিতৃগণ এসে এই কাজের প্রশংসা করেন এবং বর প্রার্থনা করতে বলেন। তখন তিনি পিতৃপুরুষের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করেন এবং অনুরোধ করেন, যাতে পাঁচটি হ্রদ পবিত্র বলে বিবেচিত হয়। পরশুরাম বর চেয়ে বলেন, “হে পিতৃগণ! যদি প্রসন্ন হইয়া ইচ্ছানুরূপ বর প্রদানে অনুগ্রহ করেন, তাহা হইলে ক্রোধে অধীর হইয়া ক্ষৎত্রিয়বংশ ধ্বংস করিয়া যে পাপরাশি সঞ্চয় করিয়াছি, সেই সকল পাপ হইতে যাহাতে মুক্ত হই এবং এই শোণিতময় পঞ্চহ্রদ অদ্যাবধি পৃথিবীতে তীর্থস্থান বলিয়া যাহাতে প্রখ্যাত হয়, এরূপ বর প্রদান করুন।’ পিতৃগণ সেই বর প্রদান করে, ক্ষত্রিয়দের হত্যা বন্ধ করার কথা বলে যান। এরপর পরশুরাম ক্ষত্রিয়নিধন বন্ধ করে দেন। এভাবে পরশুরামের পিতৃপুরুষ তাকে পাপমুক্ত করেন এবং পাঁচটি রক্ত হ্রদ একসাথে সমন্তপঞ্চক বা কুরুক্ষেত্র বলে পরিচিতি লাভ করে।
এরপর তিনি যজ্ঞের দ্বারা কশ্যপকে পৃথিবী দান করে, মহেন্দ্রপর্বতে বসবাস শুরু করেন।

কুরুক্ষেত্রে কর্ণের করুণ মৃত্যুর কারণ পরশুরামের অভিশাপ

পরশুরাম ছিলেন কুরু পিতামহ ভীষ্ম ও কর্ণের অস্ত্রগুরু। একদা ভীষ্ম তার সৎ ভাই বিচিত্রবীর্যের বিয়ের জন্য কাশীরাজের তিন কন্যা (অম্বা, অম্বিকা ও অম্বালিকা)-কে স্বয়ংবর সভা থেকে অপহরণ করে নিয়ে আসেন। এর ভিতর ঘটনাক্রমে কাশীরাজের বড় মেয়ে অম্বা জানান যে, তিনি আগে থেকে শাম্বরাজকে স্বামী হিসেবে মেনে নেয়ায় বিচিত্রবীর্যকে বিয়ে করা তার পক্ষে সম্ভব নয়। তখন ভীষ্ম অম্বাকে শাম্বরাজের কাছ পাঠিয়ে দেন। কিন্তু অপহৃতা কন্যা বলে শাম্বরাজ মেয়েকে প্রত্যাখান করেন। শাম্বরাজ অম্বাকে আর গ্রহণ না করায় অম্বা ভীষ্মের কাছে ফিরে আসেন এবং তাকে বিয়ে করার জন্য অনুরোধ জানান।
কিন্তু ভীষ্ম আজন্ম ব্রহ্মচারী থাকার প্রতিজ্ঞা করায় তার পক্ষে অম্বাকে বিয়ে করা সম্ভব নয় বলে জানান। অম্বা তখন পরশুরামের কাছে ন্যায়বিচার প্রার্থনা করেন। পরশুরাম এসেও ভীষ্মকে এই বিয়েতে রাজি করাতে ব্যর্থ হলেন। তখন পরশুরামের সাথে ভীষ্মের ভীষণ যুদ্ধ শুরু হয়। ২৩ দিন যুদ্ধের পরও নিজ শিষ্য ভীষ্মকে পরাজিত করতে ব্যর্থ হয়ে পরশুরাম প্রতিজ্ঞা করেন, জীবনে আর কোনো ক্ষত্রিয়কে অস্ত্রশিক্ষা দেবেন না। ভীষ্মকে পরাজিত করতে অসমর্থ হয়ে পুনরায় মহেন্দ্র পর্বতে ফিরে যান এবং অস্ত্রলাভের জন্য মহাদেবের কঠোর তপস্যায় ব্রতী হন। তপস্যায় খুশি হয়ে মহাদেব পরশুরামকে জগতের কল্যাণের জন্য ও মহাদেবের সন্তুষ্টির জন্য দেব-শত্রুদের ধ্বংস করার আশীর্বাদ প্রদান করেন। এ সময়েই মহাদেব তুষ্ট হয়ে তাঁকে পরশু নামক অস্ত্র দান করেছিলেন। এরপর তিনি মহাদেবের আজ্ঞায় বহু দানব হত্যা করেন।
এর কিছুকাল পরে মহাবীর কর্ণ অস্ত্রশিক্ষা লাভের জন্য পরশুরামের কাছে উপস্থিত হন। কর্ণ জানতেন যে, পরশুরাম ক্ষত্রিয়বংশজাত কোনো ব্যক্তিকে অস্ত্রশিক্ষা দেবেন না। তাই কর্ণ নিজের পরিচয় গোপন করে ব্রাহ্মণের বেশে পরশুরামের কাছে ব্রহ্মাস্ত্র শিক্ষার জন্য যান এবং অস্ত্রশিক্ষা নিতে থাকেন। এরপর নিজেকে একজন বড় ধনুর্বিদ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন।
গুরুর কাছ থেকে বিভিন্ন অস্ত্রের ব্যবহারের কৌশল রপ্ত করতে সক্ষম হন কর্ণ। কিন্তু একদিন পরশুরাম কর্ণের উরুতে মাথা রেখে ঘুমিয়ে থাকা অবস্থায় কর্ণকে অলর্ক কীট আক্রমণ করে। গুরুর ঘুম ভেঙে যাবার ভয়ে কর্ণ যন্ত্রণা নিরবে সহ্য করতে থাকেন। পরে পরশুরাম ঘুম ভেঙে উঠে সকল বিষয় দেখে এবং কর্ণের কষ্ট সহিষ্ণুতা লক্ষ্য করে তার প্রকৃত পরিচয় জানতে চান। প্রকৃত পরিচয় পেয়ে পরশুরাম কর্ণের ছলনার কথা জানতে পারেন। অবশেষে কর্ণ ব্রাহ্মণ নয় জেনে এবং গুরুকে প্রতারণা করার জন্য অভিশাপ দিয়ে বললেন যে, কপট উপায়ে ব্রহ্মাস্ত্র লাভের জন্য কার্যকালে কর্ণ এই অস্ত্রের কথা ভুলে যাবেন। এ কারণেই পরবর্তীতে কুরুক্ষেত্রে কর্ণের করুণ মৃত্যু ঘটেছিল।

 

যেভাবে অমরত্ব পেলেন পরশুরাম

রামায়ণ ও মহাভারত দুইটি ভিন্ন যুগের কাহিনী হলেও এই দুই মহাকাব্যেই তার উপস্থিতি বেশ লক্ষণীয়। পরবর্তীতে পুনরায় মহেন্দ্র পর্বতে দীর্ঘদিন তপস্যা করার পর প্রচুর ব্রহ্মতেজ অর্জনের পর পরশুরাম পর্বত থেকে নেমে আসেন। সমতলে নেমেই প্রথমে তিনি অযোধ্যার রাজা রামের মুখোমুখি হলেন। রামায়ণে আছে- পরশুরামের অর্ন্তধানের পূর্বেই বিষ্ণুর সপ্তম অবতার রামের জন্ম হয়।
রামচন্দ্র তখন সবে হরধনু ভঙ্গ করেছেন। হরধনু ভঙ্গের পর সীতাসহ তিনি অযোধ্যায় ফিরে আসছিলেন। এই হরধনুটি আবার পরশুরাম জনক রাজাকে উপহার দিয়েছিলেন। জনকরাজ শর্ত রেখেছিলেন যে এই ধনুকে যে ব্যক্তি গুন পরাতে পারবেন, তার সঙ্গেই তিনি কন্যা সীতার বিয়ে দেবেন। রাম সে পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে সীতাকে বিয়ে করেন। এমনিতেই পরশুরাম রামের উপর ভীষণ অসন্তুষ্ট ছিলেন। হরধনু ভঙ্গের কথাটি জানতে পেরে পরশুরাম ক্রোধান্বিত হয়ে রামের মুখোমুখি হন। তিনি রামকে দর্পভরে বলেন, রামের যদি এতই শক্তি, তবে তিনি যেন তার বৈষ্ণবী ধনুকে গুন পরিয়ে দেখান। আর রাম যদি এতে ব্যর্থ হন তাহলে তাকে দ্বন্দ্বযুদ্ধে অবতীর্ণ হতে হবে বলে চ্যালেঞ্জ করেন পরশুরাম। এরপর বৈষ্ণব ধনু নিয়ে পরশুরামের তপস্যার্জিত সমস্ত শক্তি বিনষ্ট করেন রাম। ফলে পরশুরামের তেজ ক্ষয়প্রাপ্ত হয়। এরপর পরশুরাম নির্বীর্য হয়ে রামচন্দ্রকে পূজা ও প্রদক্ষিণ করে মহেন্দ্র পর্বতে ফিরে যান।
তারপর থেকেই সেখানে তিনি আছেন। আর এভাবে পরশুরাম না মরে বেঁচে রইলেন। পুরাণমতে, পরে অবশ্য পূর্বপুরুষদের কাছে ক্ষমা স্বীকার করে তিনি মোক্ষলাভ করেন।

পরশুরামকে উদ্দেশ্যে নিবেদিত মন্দির

রাম, কৃষ্ণ বা বুদ্ধের ন্যায় পরশুরাম যদিও বিষ্ণুর জনপ্রিয় অবতারদের মতো পূজিত হন না, তবুও তার উদ্দেশ্যে নিবেদিত বহু মন্দির রয়েছে। আখালকোট, খাপোলি এবং মহারাষ্ট্রের রত্নগিরি, গুজরাট ভ্রূষ এবং সোনাধ ও পার্বত্য চট্টগ্রামের পরশুরাম মন্দির এবং জম্মু ও কাশ্মীরের অহনার যার মধ্যে অন্যতম।

 

পরশুরামের মূর্তি

চিত্র: পরশুরামের মূর্তি

ভারতের পশ্চিম উপকূলে কোনাকান অঞ্চলকে এখনও “পরশুরাম ভূখন্ড ” নামে অভিহিত করা হয়। উত্তর ভারতের রাজ্য অরুণাচল প্রদেশের লোহিত জেলার পরশুরাম কুণ্ডটি একটি পবিত্র হ্রদ, যার জলে আজো শত শত ভক্তবৃন্দ প্রতি জানুয়ারির মকরসংক্রান্তির সময় পূণ্য ও পাপমোচনের আশায় ডুবা দেয় ।

 

তথ্যসূত্র:

১. মহাভারত। আদিপর্ব। দ্বিতীয় অধ্যায়। সমন্তপঞ্চকোপাখ্যান।

২. একোনবিংশ সর্গ- বালখণ্ড- বাল্মীকি রামায়ণ

২. মহাভারত- রাজশেখর বসু

Featured Image: mygodpictures.com

Sharing is caring!

Shajahan Manik

ইংরেজি প্রভাষক শাহ্জাহান মানিক একাধারে কবি, লেখক, গবেষক ও অনুবাদক। একাধিক কাব্যগ্রন্থ ছাড়াও তার অনুদিত বইয়ের সংখ্যা ১০টি। এছাড়া সায়েন্স ফিকশন, সম্পাদনা, ছোটদের বইয়ের পাশাপাশি তার রয়েছে ইংরেজি শেখার বই। তার সর্বশেষ প্রকাশিত গ্রন্থ হচ্ছে- মানব কল্যাণে মুসলিম বিজ্ঞানীদের অবদান।

https://besorgo.com

3 thoughts on “পরশুরাম: মাতৃহত্যা পাপে অভিশপ্ত হয়েও যিনি ছিলেন অবতার

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *