উট যখন লাইব্রেরি

উট যখন লাইব্রেরি

নির্বাচিত পোস্ট সাম্প্রতিক বিশ্ব
উট যখন লাইব্রেরি তখন অসাধারণ এক দৃশ্যের অবতারণা হয় আমাদের ভাবনায়। উঁচু-নিচু মরুপথ দিয়ে ধীর গতিতে এগিয়ে চলা এ পাঠাগারের কথা আমরা আজ জানবো।
বই পড়া যেমন জ্ঞান বৃদ্ধিতে সহায়ক তেমনি নিয়মিত পাঠাভ্যাস ডিমেনশিয়া এবং অ্যালজাইমা সহ মানসিক উত্তেজনা প্রশমনে সহায়তা করে। আর সব বই প্রেমি পাঠকদের বই পড়ার তৃষ্ণা মেটাতে লাইব্রেরির ভূমিকা যে কতো অপরিসীম তা বলার অপেক্ষা রাখে না। বলা হয়ে থাকে, একটি জাতির লাইব্রেরি যত বেশি সমৃদ্ধ সে জাতি তত বেশি সমৃদ্ধ। আবার এমনও কথা প্রচলিক রয়েছে, একটি জাতিকে ধ্বংস করতে চাইলে সবার আগে তার জ্ঞানের ভান্ডার লাইব্রেরি ধ্বংস করাই যথেষ্ঠ। অতীত ইতিহাস ঘাটলে এর বহু প্রমাণ আমরা খুঁজে পাবো।

লাইব্রেরি বলতে আমাদের চোখের সামনে ভেসে ওঠে সারিবদ্ধ বুক শেলফে সাজানো হাজারো বইয়ের সংগ্রহ। বর্তমান বিশ্বে এমনও সব লাইব্রেরি রয়েছে যা পাঠকের জ্ঞান তৃষ্ণা মেটানোর পাশাপাশি এর দৃষ্টিনন্দন নির্মাণশৈলী চোখ ও মন জুড়ায়। এমন লাইব্রেরি উদাহরণ দিতে গেলে প্রথম সারিতে চলে আসবে আমেরিকান লাইব্রেরি অব কংগ্রেস, ব্রিটিশ লাইব্রেরি, ন্যাশনাল লাইব্রেরি অব চায়না, ন্যাশনাল লাইব্রেরি অব কানাডা, হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় লাইব্রেরি, ডয়েচে বিবলিওথিক, রাশিয়ান স্টেট লাইব্রেরি, ন্যাশনাল ডায়েট লাইব্রেরি, নিউইয়র্ক পাবলিক লাইব্রেরি, প্রভৃতির নাম। যাদের সংগ্রহে রয়েছে কোটির উপরে বই।

এ তো গেল গতানুগতিক ধারার লাইব্রেরি কথা। এ ধরণের স্থায়ী লাইব্রেরির পাশাপাশি বর্তমান যুগে ভিন্ন ধারার লাইব্রেরিরও দেখা আমরা পাই। ভ্রাম্যমাণ লাইব্রেরির কথা প্রথমে আসবে এ ক্ষেত্রে। ভ্রাম্যমাণ লাইব্রেরি মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে দূরে-কাছে সব পাঠকের দোরগোড়ায় বই পড়ার তৃষ্ণা নিবারণ করা। এই ধারা পৃথিবীর বহু দেশেই দেখা পাওয়া যায়। একটি গাড়িকে লাইব্রেরি বানিয়ে যেখানে সেখানে ছুটে চলতে পারে এ ধরণের ভ্রাম্যমাণ লাইব্রেরি। এমনকি ভ্যানে করেও পাঠকের কাছে বই পৌঁছে দেবার খবরও আমরা পাই। বাংলাদেশের বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্রের ভ্রাম্যমাণ গ্রন্থাগারের কথা আমরা সবাই জানি।

কিন্তু এখন সম্পূর্ণ ভিন্ন এক লাইব্রেরির কথা সবার সামনে আনতে যাচ্ছি। এটিও অবশ্য ভ্রাম্যমাণ, তবে চার চাকায় এটি চলে না। চলে চার পায়ে হেঁটে। উঁচু-নিচু মরুপথ দিয়ে ধীর গতিতে এগিয়ে চলে এ লাইব্রেরি। পিঠে কোনো সওয়ার থাকে না তার। বরং পিঠের দু’দিকে থাকে গুচ্ছ গুচ্ছ বই। মরুপথের কথা শুনে সহজেই নিশ্চয় অনুমান করা যাচ্ছে চার পায়ের প্রাণীটি কি হতে পারে! হ্যাঁ, উটের কথাই বলছি। পাকিস্তানের বালুচিস্তানের প্রত্যন্ত গ্রামের আনাচে-কানাচে শিক্ষার আলো পৌঁছে দিতে এই উট বই পিঠে নিয়ে কাজ করে যাচ্ছে অবিরত। যেহেতু উটের উপর এই লাইব্রেরি তাই এর নাম দেওয়া যেতে পারে উট-লাইব্রেরি। আর এই উটটির নামও কিন্তু দারুন! নাম রোশন। সত্যিই ঘরে ঘরে ‘রোশনাই’ পৌঁছে দিচ্ছে সে।

উট যেভাবে লাইব্রেরি হলো

ঘটনাটি পাকিস্তানের বালুচিস্তানের প্রত্যন্ত জেলা কেজ এর প্রত্যন্ত একটি এলাকার। এ জেলার বেশির ভাগ মানুষকে দারিদ্রতার সাথে লড়াই করে বাঁচতে হয়। এমনিতেই শিক্ষার হার কম। তার উপর করোনা প্রকোপের জন্য ২০২০ সাল থেকে সে এলাকার স্কুল-কলেজ পুরোপুরি বন্ধ। স্কুল কবে চালু হবে তাও কারো জানা নেই। ফলে একেবারেই ভেঙে পড়েছিল এই জেলার শিক্ষা ব্যবস্থা। এই দীর্ঘ বন্ধের কারণে পড়াশোনা থেকে মুখ ফিরিয়ে রাখা ছেলেমেয়েরা ঝড়ে পড়বে, এই বিষয়গুলিই ভাবিয়ে তুলেছিল রহিমা জালালকে।
রহিমা হচ্ছেন এ জেলার একটি স্কুলের প্রধান। অতিমারির কারণে তার নিজের স্কুলও বহু দিন থেকে বন্ধ হয়ে রয়েছে। স্কুল বন্ধ থাকায় নিজের এলাকার ছোট ছোট শিশুরা যাতে পড়াশোনা থেকে বঞ্চিত না হয় এর উপায় ভাবতে শুরু করেন তিনি। তাকে সাহায্য করতে এগিয়ে আসে তার বোন, যিনি আবার পাকিস্তানের একটি প্রদেশের মন্ত্রীও।
রহিমা এবং তার বোন মিলে এর উপায় ভাবতে শুরু করেন। তখন তাদের মাথায় আসে এক অভিনব পরিকল্পনা। তারা এমন কিছু উপায় আনতে চেয়েছিলেন যাতে বাড়িতে বসেই পড়াশোনা করা যাবে। অনলাইন ক্লাসের সুযোগ ও সামর্থ ঐ অঞ্চলের শিক্ষার্থীদের ছিল না। তাদের না রয়েছে মোবাইল ফোন এবং না আছে সেখানে ভালো নেটওয়ার্ক পরিষেবা। ফলে অনলাইনে তাদে শিক্ষাদান সম্ভব ছিল না।

তাই তাদের কথা ভেবে চলন্ত লাইব্রেরি চালু করলেন তারা। সেকারণেই উটের সাহায্যে তাদের পড়াশোনার ব্যবস্থা করেছেন তিনি। এর ফলে কাউকে লাইব্রেরিতে যেতে হবে না, বরং লাইব্রেরি ‘চার পায়ে’ হেঁটে বাড়ি বাড়ি পৌঁছে যাবে। আর এর বাস্তবায়নে ‘রোশন’-ই হয় সে চলন্ত লাইব্রেরি, যে পিঠে বই বহন করে পৌঁছে যায় গ্রামে গ্রামে।

‘রোশন’ যেভাবে কাজ করে

রহিমা ও তার বোন শিক্ষা বিস্তারের এই ব্যবস্থার নাম দিয়েছেন Camel Library Project. এই প্রজেক্টে ‘রোশন’ কবে কোন গ্রামে কী বই নিয়ে উপস্থিত হবে তা আগে থেকেই নির্ধারণ করা থাকে। সপ্তাহে দু’দিন করে সে প্রত্যেক গ্রামে যায়। একদিন যে বই সে যাদের কাছে পৌঁছে দেয়, দ্বিতীয় দিন সে বই পাঠকারী ফেরত দেয় রোশনকে। এ নিয়মেই চলে এই প্রজেক্ট। প্রতি গ্রামে সে দু’ঘণ্টা অবস্থান করে। এই সময়ে কেউ চাইলে তার পিঠ থেকে প্রয়োজনীয় বই নিয়ে পড়ে চাইলে আবার ঐ দিনই তাকে ফেরত দিতে পারে। দু’ঘণ্টা পর বইয়ের ঢালি নিয়ে রোশন আবার যাত্রা করে অন্য আরেক গ্রামে। পরের দিন কী কী বই আনতে হবে সে তালিকাও তৈরি থাকে। এভাবে রোশন শিক্ষার রোশনাই বিলিয়ে চলেছে।

রহিমাদের এই অভিনব পরিকল্পনা বিস্তার ঘটাতে করতে পরবর্তীতে অনেকেই এগিয়ে এসেছে । এখন অবশ্য তাদের এই পদ্ধতিটি অনেক অঞ্চল অনুসরণ করে অতিমারির এই সময় শিক্ষার্থীদের পাঠদান করার সুযোগ করে দিচ্ছে।

Sharing is caring!

Shajahan Manik

ইংরেজি প্রভাষক শাহ্জাহান মানিক একাধারে কবি, লেখক, গবেষক ও অনুবাদক। একাধিক কাব্যগ্রন্থ ছাড়াও তার অনুদিত বইয়ের সংখ্যা ১০টি। এছাড়া সায়েন্স ফিকশন, সম্পাদনা, ছোটদের বইয়ের পাশাপাশি তার রয়েছে ইংরেজি শেখার বই। তার সর্বশেষ প্রকাশিত গ্রন্থ হচ্ছে- মানব কল্যাণে মুসলিম বিজ্ঞানীদের অবদান।

https://besorgo.com

2 thoughts on “উট যখন লাইব্রেরি

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *