‘মিসাইল ম্যান’ বিজ্ঞানী এ পি জে আবদুল কালাম

‘মিসাইল ম্যান’ বিজ্ঞানী এ পি জে আবদুল কালাম

জীবনী
এ পি জে আবদুল কালাম এর পুরো নাম আবুল পাকির জয়নুল আবেদিন আবদুল কালাম। একজন বিজ্ঞানী হয়েও নিজ গুণ ও কর্ম দ্বারা যে একটি দেশের রাষ্ট্রপতি হওয়া কারো দ্বারা সম্ভব তার জ্বলন্ত প্রমাণ হলেন এ পি জে আবদুল কালাম। একাধারে বৈজ্ঞানিক, শিক্ষাবিদ ও রাষ্ট্রপতি এ পি জে আবদুল কালাম ছিলেন একজন নিপাট ভদ্রলোক, সরল ও বিনয়ী মানুষ।
একজন বিজ্ঞানী হয়েও তিনি ভারতের ১১ তম রাষ্ট্রপতি হবার মর্যাদা লাভ করেছিলেন। তাঁর জীবন গল্প পৃথিবীর বুকে এমন একটি দৃষ্টান্ত হয়ে আছে যা যে কাউকেই অনুপ্রাণিত করবে। কিভাবে একজন সাধারণ মাঝির ছেলে ভারতের সবচেয়ে বড় বিজ্ঞানী হয়েছেন, তারপর একজন সফল রাষ্ট্রপতি হলেন সে গল্প সত্যি আশাজাগানিয়া ও প্রেরণার।

এ পি জে আবদুল কালাম এর ছেলেবেলা

ভারতের তামিলনাড়ু রাজ্যের রামেশ্বরমের সাধারণ এক তামিল মুসলমান দরিদ্র পরিবারে ১৯৩১ সালের ১৫ অক্টোবর জন্ম হয় এ পি জে আবদুল কালামের। তাঁর বাবার নাম আবুল ফকির জয়নাল আবেদিন এবং মায়ের নাম আশিয়াম্মা। জীবিকার তাগিদে রামেশ্বরম ও ধনুষ্কোডির মধ্যে হিন্দু তীর্থযাত্রীদের নৌকায় পারাপার করাতেন তাঁর বাবা। এক বেলা আধপেটা হয়ে দিন চলতো তাদের। অল্প বয়স থেকেই পরিবারের ভরণপোষণের জন্য কাজ শুরু করতে হয়েছিল আবদুল কালামকে। সকালে কাজ করে স্কুলে যেতেন, বিকেলে স্কুল থেকে ফিরে ফের নৌকায় মানুষ পারাপার বা পত্রিকা বিক্রির কাজে ছুটতেন। কিন্তু এতোকিছুর পরও পড়াশোনায় ছিলেন প্রচন্ড মেধাবী। মাত্র পাঁচ বছর বয়সে, পরিবারকে সাহায্য করার জন্য তিনি সংবাদপত্র বিক্রি শুরু করেন, প্রতিদিন স্কুল শেষে এই কাজ করতেন। কলেজে ভর্তির পর তাঁকে পত্রিকায় লেখালেখির কাজও শুরু করতে হয়েছিল। এ প্রসঙ্গে এক লেখায় এ পি জে আবদুল কালাম লিখেছিলেন, ‘দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ের কথা। প্রতিদিন ভোর চারটায় ঘুম থেকে উঠে অঙ্ক কষতে চলে যেতাম শিক্ষকের কাছে। সেই শিক্ষক পাঁচ জনকে অঙ্ক শেখাতেন, তার মধ্যে আমি ছিলাম। দেড় ঘণ্টা অঙ্ক কষে সকাল সাড়ে পাঁচটায় ছুটি পেয়ে তিন কিলো দৌড়ে যেতাম কেবল দৈনিক পত্রিকা আনতে। যুদ্ধের কারণে স্টেশনে ট্রেন থামতো না, আর তাই চলন্ত ট্রেন থেকে ফেলা সেই পত্রিকা আমি বিলি করতাম সারা শহর।’
তাঁর আত্মজীবনীতে তিনি ছোটবেলার কথা প্রসঙ্গে আরো বলেছেন, ‘যখন আমি ছোট ছিলাম, আমার মা আমাদের জন্য রান্না করতেন। তিনি সারাদিন প্রচুর পরিশ্রম করার পর রাতের খাবার তৈরি করতেন। এক রাতে তিনি বাবাকে এক প্লেট সবজি আর একেবারে পুড়ে যাওয়া রুটি খেতে দিলেন। আমি অপেক্ষা করছিলাম বাবার প্রতিক্রিয়া কেমন হয় সেটা দেখার জন্য। কিন্তু বাবা চুপচাপ রুটিটা খেয়ে নিলেন এবং আমাকে জিজ্ঞাসা করলেন স্কুলে আমার আজকের দিনটা কেমন গেছে। আমার মনে নেই বাবাকে সেদিন আমি কী উত্তর দিয়েছিলাম কিন্তু এটা মনে আছে যে, মা পোড়া রুটি খেতে দেয়ার জন্য বাবার কাছে ক্ষমা চেয়েছিলেন। এর উত্তরে বাবা মা-কে যা বলেছিলেন সেটা আমি কোনদিন ভুলবো না। বাবা বললেন, ‘প্রিয়তমা, পোড়া রুটিই আমার পছন্দ’। পরবর্তীতে সেদিন রাতে আমি যখন বাবাকে শুভরাত্রি বলে চুমু খেতে গিয়েছিলাম তখন আমি তাকে জিজ্ঞাসা করলাম যে তিনি কি আসলেই পোড়া রুটিটা পছন্দ করেছিলেন কিনা। বাবা আমাকে দুহাতে জড়িয়ে ধরে বললেন, ‘তোমার মা আজ সারাদিন অনেক পরিশ্রম করেছেন এবং তিনি অনেক ক্লান্ত ছিলেন। তাছাড়া একটা পোড়া রুটি খেয়ে মানুষ কষ্ট পায় না বরং মানুষ কষ্ট পায় কর্কশ ও নিষ্ঠুর কথায়।’
নিজের মায়ের সম্পর্কে আরেক লেখায় এ পি জে আবদুল কালাম লিখেছিলেন, ‘আমাদের বাড়িতে তখন বিদ্যুৎ ছিল না। সন্ধ্যা সাতটা থেকে নয়টা পর্যন্ত কেরোসিনের কুপি বাতি জ্বলতো, সেই আলোতে আমরা পড়তাম। তবে মা আমার পড়ার আগ্রহ দেখে আমাকে শোয়ার ঘরের কেরোসিনের বাতি দিতেন যেন আমি অন্তত রাত ১১টা পর্যন্ত পড়তে পারি। এখনো পূর্ণিমা দেখলে আমার মায়ের মুখটাই সর্বপ্রথম যেন দেখতে পাই।’
রামনাথপুরম স্কোয়ার্টজ ম্যাট্রিকুলেশন স্কুল থেকে তাঁর শিক্ষাজীবন শুরু হয়। স্কুলজীবন শেষ হওয়ার পর তিনি ভর্তি হন তিরুচিরাপল্লির সেন্ট জোসেফ কলেজে এবং সেখান থেকে ১৯৫৪ সালে পদার্থবিজ্ঞানে স্নাতক হন। এরপর ১৯৫৫ সালে তিনি চেন্নাই চলে আসেন এবং সেখানকার মাদ্রাজ ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি থেকে বিমানপ্রযুক্তি নিয়ে পড়াশোনা চালিয়ে যান। মাদ্রাজ ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি থেকে ইঞ্জিনিয়ারিং পড়াশোনা শেষ করার পর, কালাম ডিফেন্স রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশনে (ডিআরডিও) একজন বিজ্ঞানী হিসেবে যোগদান করেন। এর আগে অধ্যয়ন শেষে আবদুল কালামের কাছে দুই জায়গায় চাকরির আবেদনের সুযোগ এসেছিল। একটি বিমান বাহিনীতে এবং আরেকটি প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনে। তবে আবদুল কালামের স্বপ্ন ছিল মিলিটারি বেইজের একজন ফাইটার পাইলট হওয়া। নিজ আত্মজীবনীতে লিখেছিলেন, ‘বছরের পর বছর ধরে আমি স্বপ্ন দেখতাম একটি উড়ন্ত যন্ত্রের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে স্ট্রাটোস্ফিয়ারের স্তরে চষে বেড়াচ্ছি যা উড়তে থাকবে সেই উচ্চ সীমানায়।’ তাই তিনি প্রথমে যান দেরাদুন বিমান বাহিনীর ইন্টারভিউ দিতে। তিনি দেখলেন ইন্টারভিউতে বিমানবাহিনীতে শিক্ষা এবং দক্ষতার পাশাপাশি শারীরিক সক্ষমতাকে অগ্রাধিকার দেয়। তিনি ছিলেন অনেকটা হ্যাংলা পাতলা। ফলে ৯ জন প্রতিযোগির মধ্যে ৮ জনই নির্বাচিত হয় শুধুমাত্র তিনি বাদ পড়েন।

 

এ পি জে আবদুল কালাম যেভাবে বিজ্ঞানী হলেন

বাদ পড়ার খবর পাওয়ার পর মন খারাপ করে তিনি এক নদীর ধারে চলে যান। সেখানে এক সাধু তাঁকে নদীর পাড়ে বসে থাকতে দেখে বললো, ‘খোকা তুমি নদীর পাড়ে বসে আছ কেন? তোমার মন খারাপ?’ উত্তরে তিনি বললেন, ‘আমার জীবনের কোনো অর্থ নেই। আমি পাইলট হতে চেয়েছিলাম, কিন্তু ভর্তি পরীক্ষায় ফেল করেছি। এই জীবনের কোনো অর্থ পাচ্ছি না।’ সাধু হেসে বললেন, ‘বাবা তুমি পরীক্ষায় ফেল করেছো। এটারও নিশ্চয়ই কোনো অর্থ আছে। ভাগ্য হয়তো তোমাকে অন্য কিছুর জন্য তৈরি করেছে। খুঁজে দেখো, এই পথ তোমার জন্য নয়।’
এরপর তিনি বিমান প্রযুক্তি বিষয়ে পড়েন। ডিআরডিও-তে কালাম ভারতীয় সেনাবাহিনীর জন্য একটি ছোট হেলিকপ্টার ডিজাইন করে তাঁর কর্মজীবন শুরু করেছিলেন। তারপর ১৯৬৯ সালে, তিনি ভারতীয় মহাকাশ গবেষণা সংস্থায়(ইসরো) বদলি হন। এখানে তিনি ভারতের স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণ যানবাহন প্রকল্পের পরিচালক হিসেবে নিযুক্ত হন। এই প্রকল্পের সাফল্যের ফলস্বরূপ, ভারতের প্রথম উপগ্রহ ‘রোহিণী’ ১৯৮০ সালে পৃথিবীর কক্ষপথে স্থাপন করা হয়েছিল। ইসরোতে যোগদান ছিল কালামের ক্যারিয়ারের টার্নিং পয়েন্ট। ইসরোতে কাজ করার সময় তিনি দেশ-বিদেশে অনেক খ্যাতি অর্জন করেন। ১৯৬৩-১৯৬৪ এর সময় তিনি মার্কিন মহাকাশ সংস্থা নাসাতেও ভ্রমণ করেছিলেন। পরমাণু বিজ্ঞানী রাজা রামান্না, যার হাত ধরে ভারত প্রথম পারমাণবিক পরীক্ষা চালায়, তিনি কালামকে ১৯৭৪ সালে পোখরানে পারমাণবিক পরীক্ষার সাক্ষী হওয়ার জন্য আমন্ত্রণ জানান। সেইসময় রাজা রামান্নার সাথে মিলে ভারতের প্রথম পারমাণবিক ক্ষেপনাস্ত্র তৈরি করতে সক্ষম হন তিনি।
১৯৯৮ সালে স্যার এ পি জে আবদুল কালামের নেতৃত্বে ভারত দ্বিতীয়বারের জন্য পরমাণু বোমার সফলভাবে পরীক্ষা করতে সক্ষম হয়। যার সুবাদে তিনি সেইসময় হয়ে ওঠেন ভারতের সবথেকে বিখ্যাত এবং সফল পরমাণু বৈজ্ঞানিক। তাঁর জন্যই ভারত আজ পরমাণু হাতিয়ার নির্মাণ করতে সফল হতে পেরেছে। ভারতের মহাকাশ কর্মসূচি এবং ক্ষেপণাস্ত্র উন্নয়ন কর্মসূচির এইসব অগ্রণী ভূমিকার জন্যে পরবর্তীতে তাঁকে ‘মিসাইল ম্যান’ বলে ডাকা হতো।

এ পি জে আবদুল কালাম যেভাবে রাষ্ট্রপতি হলেন

এসবের বাইরে ১৯৯৮ সালে, ড. কালাম হার্টের ডাক্তার সোমা রাজুর সহযোগিতায় কম খরচে ‘করোনারি স্টেন্ট’ তৈরি করেছিলেন। এর নাম দেওয়া হয়েছিল ‘কালাম-রাজু স্টেন্ট’। এভাবে ড. কালাম সত্তর ও আশির দশকে তাঁর কাজ এবং সাফল্যের মাধ্যমে ভারতে ও বিশ্বে খুব বিখ্যাত হয়েছিলেন এবং তাঁর নাম ভারতের সর্বশ্রেষ্ঠ বিজ্ঞানীদের মধ্যে গণনা করা হয়। তাঁর খ্যাতি এতটাই বেড়ে গিয়েছিল যে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী তাঁর মন্ত্রিসভার অনুমোদন ছাড়াই তাঁকে কিছু গোপন প্রকল্পে কাজ করার অনুমতি দিয়েছিলেন। ড. কালামের তত্ত্বাবধানে ভারত সরকার উচ্চাভিলাষী ‘ইন্টিগ্রেটেড গাইডেড মিসাইল ডেভেলপমেন্ট পোগ্রাম’ শুরু করেছিল। তিনি ছিলেন সে প্রকল্পের প্রধান নির্বাহী। জুলাই ১৯৯২ থেকে ডিসেম্বর ১৯৯৯ পর্যন্ত ড. কালাম তৎকালীন ভারতের প্রধানমন্ত্রীর বৈজ্ঞানিক উপদেষ্টা এবং প্রতিরক্ষা গবেষণা ও উন্নয়ন সংস্থার (ডিআরডিও) সচিব ছিলেন।
২০০২ সালে ভারতের জন্যে তাঁর অবদান এবং তাঁর প্রতি জনতার সম্মানকে লক্ষ্য করে তৎকালীন এনডিএ সরকার তাঁকে ভারতের রাষ্ট্রপতি পদের জন্য প্রার্থী হিসাবে ঘোষণা করে। ফলস্বরূপ, সেবছরেই তিনি ভারতের রাষ্ট্রপতি হিসাবে নির্বাচিত হন এবং ২৫ জুলাই ২০০২ সালে ভারতের ১১ তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন। রাষ্ট্রপতি হয়েও তিনি ছিলেন খুব বিনয়ী, সহজ ও সরল।

 

ব্যক্তিগত প্রয়োজনে রাষ্ট্রের অর্থ ব্যয় করতেন না এ পি জে আবদুল কালাম

ব্যক্তিগত প্রয়োজনে কখনো রাষ্ট্রের কোষাগার থেকে অর্থ ব্যয় করেননি। এ বিষয়ে অসংখ্য দৃষ্টান্ত আছে-
২০০২ সালে এ পি জে আবদুল কালাম যখন রাষ্ট্রপতির পদ গ্রহন করেছিলেন তখন রমজান মাস। ভারতীয় রাষ্ট্রপতির জন্য একটা নিয়মিত রেওয়াজ ছিল যে রমজান মাসে তিনি একটি ইফতার পার্টির আয়োজন করবেন। একদিন আবদুল কালাম তাঁর সচিব পি এম নায়রাকে বললেন, ‘কেন তিনি একটি পার্টির আয়োজন করবেন? কারণ, এমন পার্টিতে আগত অতিথিরা সর্বদা ভালো খাবার খেয়ে অভ্যস্ত।’ তিনি পি এম নায়ারের কাছে জানতে চাইলেন, ‘একটি ইফতার পার্টির আয়োজনে কত খরচ পড়ে?’ পি এম নায়ার তাঁকে বললেন, ‘প্রায় ২২ লাখ রুপি খরচ হয়।’ এ পি জে আবদুল কালাম তাকে নির্দেশ দিয়ে বললেন, ‘কয়েকটা নির্দিষ্ট এতিমখানায় এই অর্থ দিয়ে খাদ্য, পোশাক ও কম্বল কিনে দান করতে হবে।’ রাষ্ট্রপতি ভবনের কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে গঠিত একটি টিম এতিমখানা বাছাইয়ের দায়িত্ব পেয়েছিল। মজার বিষয় হলো এ ক্ষেত্রে এ পি জে আবদুল কালাম কোনো ভূমিকাই পালন করেননি। এতিমখানা বাছাইয়ের পরে এ পি জে আবদুল কালাম পি এম নায়ারকে তাঁর কক্ষে ডেকে তার হাতে এক লাখ রুপির একটি চেক দিয়ে বললেন, তিনি তাঁর ব্যক্তিগত সঞ্চয় থেকেও কিছু অর্থ দান করছেন। কিন্তু এ তথ্য কারও কাছে প্রকাশ করা যাবে না। পরে পি এম নায়ার বলেছিলেন, আমি এতোটাই অবাক হয়েছিলাম যে আমি তৎক্ষণাৎ বললাম, ‘স্যার, আমি এখনই বাইরে যাব এবং সবাইকে বলব। কারণ, মানুষের জানা উচিত, এখানে এমন একজন মানুষ রয়েছেন, যে অর্থ তাঁর খরচ করা উচিত শুধু সেটাই তিনি দান করেননি, সেই সঙ্গে তিনি নিজের অর্থও বিলিয়েছেন।’
এ পি জে আবদুল কালাম কতোটা সৎ ছিলেন তা সত্যি বিস্ময়কর। আরেক ঘটনায় এর প্র্রমাণ মেলে। একবার এ পি জে আবদুল কালাম তাঁর আত্মীয়দের দিল্লিতে নিজের কাছে বেড়ানোর আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। তারা সবাই রাষ্ট্রপতি ভবনে থাকবেন এটাই নিয়ম। আর তাঁর স্বজনেরা দিল্লি শহর ঘুরে দেখবেন। যা স্বাভাবিকভাবে রাষ্ট্রীয় খরচেই হয়ে থাকে। কারণ রাষ্ট্রপতির অতিথিদের জন্য সবসময় গাড়ি বরাদ্দ থাকে। কিন্তু এসবের ধার ধারলেন না এ পি জে আবদুল কালাম। বাস ভাড়া করা হলো তাঁর সব অতিথিদের জন্য। সে খরচ নিজের পকেট থেকে দিয়েছিলেন তিনি। সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হলো এ পি জে আবদুল কালামের নির্দেশে তাঁর আত্মীয় স্বজনদের থাকা-খাওয়ার খরচের হিসেবও করতে হয়েছিল। যার হিসেব দাঁড়িয়েছিল ২ লাখ রুপির বেশি। যা সম্পূর্ণ পরিশোধ করেছিলেন তিনি। ভারতীয় ইতিহাসে আর কোনো রাষ্ট্রপতি এমনটি করেননি। এখানেই শেষ নয়। এ পি জে আবদুল কালাম একবার চাইলেন তাঁর সঙ্গে তাঁর বড় ভাই পুরো এক সপ্তাহ যাতে সময় কাটান। তাই হলো। কিন্তু তিনি চলে যাওয়ার পরে তাঁর ভাইয়ের রুমভাড়া বাবদ তিনি অর্থ পরিশোধ করতে চাইলেন। কল্পনা করা যায়! একটি দেশের রাষ্ট্রপতি এমন একটি কক্ষের জন্য ভাড়া পরিশোধ করতে চাইছেন, যা তাঁর নিজের জন্যই বরাদ্দ। তবে এবারে রাষ্ট্রপতির ইচ্ছা পূরণ হলো না। কারণ, তাঁর ব্যক্তিগত স্টাফরা ভেবেছিলেন, এতোখানি সততা অনুসরণ তাদের পক্ষে বিদ্যমান বিধির আওতায় সামাল দেওয়া কঠিন।

 

কখনোই কাজ থেকে ছুটি নেননি এ পি জে আবদুল কালাম

এ পি জে আবদুল কালাম নিজে দারুণ কবিতা লিখতেন, সঙ্গীতের প্রতি তাঁর ছিল গভীর অনুরাগ। বিশেষ করে উচ্চাঙ্গ সঙ্গীত। কবিতা লেখা নিয়ে তিনি তাঁর আত্মকথায় বলেছিলেন, ‘গভীর দুঃখে কিংবা প্রচন্ড আনন্দেই মানুষ কেবল কবিতা লেখে।’
কখনোই কাজ থেকে ছুটি নেননি এ পি জে আবদুল কালাম। ২০০৭ সালে রাষ্ট্রপতির মেয়াদ পূর্ণ করার পর অবসরেও সারা ভারতবর্ষ জুড়ে চষে বেড়িয়েছেন শিশু কিশোর তরুণ শিক্ষার্থীদের উদ্বুব্ধ করার কাজে, স্বপ্ন দেখিয়েছেন বারে বারে। রাষ্ট্রপতির পদ থেকে অবসর নেওয়ার পর ড. কালাম শিক্ষকতা, লেখালেখি, নির্দেশনা এবং গবেষণায় নিযুক্ত ছিলেন এবং ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অফ ম্যানেজমেন্ট, শিলং; ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অফ ম্যানেজমেন্ট, আহমেদাবাদ; ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অফ ম্যানেজমেন্ট, ইন্দোর এর অধ্যাপক হিসাবে যুক্ত ছিলেন। তিনি আইআইটি হায়দ্রাবাদ, বেনারস হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয় এবং আনা বিশ্ববিদ্যায়ে তথ্যবিষয়ে পড়াতেন।
শিক্ষকতা ছাড়াও ড. আবদুল কালাম বেশ কয়েকটি বই লিখেছেন যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো ‘ইন্ডিয়া ২০২০: এ ভিশন ফর দ্য নিউ মিলেনিয়াম’, ‘উইংস অফ ফায়ার: অ্যান অটোবায়োগ্রাফি’, ‘ইগনাইটেড মাইন্ডস: আনলিশিং দ্য পাওয়ার ইন ইন্ডিয়া’, ‘মিশন ইন্ডিয়া’, ‘অদম্য আত্মা’, Manifesto for Change, The Life Tree, Turning Points, ইত্যাদি সহ বিভিন্ন ভাষায় ৩০ টিরও অধিক গ্রন্থ রচনা করেছেন।

 

বিশ্ব ছাত্র দিবস ও এ পি জে আবদুল কালাম

দেশ ও সমাজের জন্য নিজের অবদানের স্বীকৃতি স্বরূপ ড. কালাম অসংখ্য পুরস্কার ও সম্মানে ভূষিত হয়েছেন। ইউরোপ, আমেরিকার বহু বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে সম্মানসূচক ডক্টরেট প্রদান করেছে এবং ভারত সরকার তাঁকে বীর সাভারকার পুরস্কার, পদ্মভূষণ, পদ্মবিভূষণ এবং ভারতের সর্বোচ্চ বেসামরিক পুরস্কার ‘ভারতরতœ’ দিয়ে সম্মানিত করেছে। এছাড়া রয়েল সোসাইটি, ব্রিটেন কর্তৃক হুভার পুরস্কার; ক্যালিফোর্নিয়া ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃক আন্তর্জাতিক কেরমান ভন উইংস পুরস্কার; রয়েল সোসাইটি, ব্রিটেন কর্তৃক চার্লস দ্বিতীয় পদক; ভারতের ইন্দিরা গান্ধী পুরস্কার, রামানুজন অ্যাওয়ার্ড সহ অসংখ্য পুরস্কার ও সম্মাননায় ভূষিত হন। তাঁকে স্মরণ করার জন্য প্রতি বছর ১৫ অক্টোবর ‘বিশ্ব ছাত্র দিবস’ পালিত হয়। ২০১০ সালে আবদুল কালামের ৭৯তম জন্মদিনে জাতিসংঘ প্রথম এই দিনটি পালন করে।
ভারতসহ বিশ্বের লাখো তরুণের কাছে এ পি জে আবদুল কালাম পুরোপুরি একজন স্বপ্নবাজ মানুষ, স্বপ্নের ফেরিওয়ালা। শিক্ষার্থীদের কাছে তিনি ছিলেন চিরকালীন অনুপ্রেরণার সঙ্গী। তাঁর অমীয় বাণীগুলো আজও বিশ্ববাসীকে প্রেরণা যোগায়। তিনি নিজে যেমন স্বপ্ন দেখেছেন আজীবন, ছুটেছেন স্বপ্নের পিছু পিছু, ঠিক তেমনি স্বপ্ন দেখিয়েছেন প্রজন্মকে। বলতেন, ‘মানুষ ঘুমিয়ে যা দেখে তা স্বপ্ন নয়। স্বপ্ন হলো সেটাই- যা মানুষকে ঘুমাতে দেয় না।’
মাঝে মাঝে তিনি শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্যে বলতেন, ‘কখনো যদি নিজেকে একা মনে হয় তখন আকাশের দিকে তাকাবে। আমরা একা নই। পুরো মহাবিশ্ব আমাদের প্রতি বন্ধুত্বসুলভ। যারা কাজ করে ও স্বপ্ন দেখে প্রকৃতিও তাদের সাহায্য করে।’ তরুণদের জন্য তাঁর বার্তা ছিল, ‘অন্য রকমভাবে চিন্তা করো। নতুন কিছু সৃষ্টি করার সাহস রাখো। সাফল্যের পথে সমস্যাগুলো চিহ্নিত করো। একসঙ্গে কাজ করার জন্য এগুলোই বড় গুণ।’ এই দৃষ্টান্ত স্থাপন করা মানুষটি কখনও অর্থ বা জনপ্রিয়তার পিছনে ছুটেননি। চলেছিলেন শুধু নিজের স্বপ্নের পথে। বছরের পর বছর, যুগের পর যুগ তিনি যেন স্বপ্নমানবের মতো হেঁটে গেছেন। বারবার বলতেন, ‘আমরা যদি উন্নত ও নিরাপদ বিশ্ব রেখে যেতে পারি তাহলেই আমাদের পরবর্তী প্রজন্ম আমাদের স্মরণ করবে।’

 

আজও বিশ্ববাসীর প্রেরণাদাতা এ পি জে আবদুল কালাম

ক্ষণজন্মা এই মহাপুরুষ ২০১৫ খ্রিস্টাব্দের ২৭ জুলাই, সোমবার, মেঘালয়ের শিলং শহরে অবস্থিত ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অব ম্যানেজমেন্টের এক অনুষ্ঠানে বসবাসযোগ্য পৃথিবী বিষয়ে বক্তব্য রাখার সময় ভারতীয় সময় সন্ধ্যা ৬:৩০ মিনিটে হৃদরোগে আক্রান্ত হন। তাঁকে দ্রুত বেথানী হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলেও সব চেষ্টা ব্যর্থ করে সন্ধ্যা ৭:৪৫ মিনিটে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন। নিজের এই মৃত্যুদিনের কথা ভেবে তিনি একবার লিখেছিলেন, ‘আমার মৃত্যুতে ছুটি ঘোষণা করবেন না। যদি আমাকে ভালোবেসে থাকেন তবে সেদিন মন দিয়ে কাজ করবেন।’ কিন্তু পুরো ভারত তাঁর এই কথা সেদিন রাখতে পারেনি। তাদের প্রাক্তন রাষ্ট্রপতির মৃত্যুতে পুরো দেশ জুড়ে ৭ দিনের রাষ্ট্রীয় শোক ঘোষণা করা হয়। বিশ্ব জুড়ে সেদিন শোকের ছায়া নেমে এসেছিল।
সারা বিশ্বের তরুনদের অত্যন্ত প্রিয় অকৃতদার এই রাষ্ট্রপতি-বিজ্ঞানী ও স্বপ্নমানব আবুল পাকির জয়নুল আবেদিন আবদুল কালামকে আজও বিশ্ববাসী তাদের প্রেরণাদাতা হিসেবে বিনম্র শ্রদ্ধায় স্মরণ করে।

Sharing is caring!

Shajahan Manik

ইংরেজি প্রভাষক শাহ্জাহান মানিক একাধারে কবি, লেখক, গবেষক ও অনুবাদক। একাধিক কাব্যগ্রন্থ ছাড়াও তার অনুদিত বইয়ের সংখ্যা ১০টি। এছাড়া সায়েন্স ফিকশন, সম্পাদনা, ছোটদের বইয়ের পাশাপাশি তার রয়েছে ইংরেজি শেখার বই। তার সর্বশেষ প্রকাশিত গ্রন্থ হচ্ছে- মানব কল্যাণে মুসলিম বিজ্ঞানীদের অবদান।

https://besorgo.com

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *