প্লটো (Pluto) কেন গ্রহ হতে পারলো না! 

প্লটো (Pluto) কেন গ্রহ হতে পারলো না ! 

জানা অজানা পাচমিশালী বিজ্ঞান

প্লটো কেন গ্রহ হতে পারলো না! 

একসময়ে আমরা জানতাম সৌরজগতে ৯টি গ্রহ এবং প্লটো (Pluto)  একটা গ্রহের নাম। এটি সৌরজগতের নবম গ্রহ রূপে পরিচিত ছিল। প্রথমে প্লটোকে একটি গ্রহ বিবেচনা করা হলেও পরবর্তীতে গ্রহ হতে গেলে যেসব শর্ত পূরণ করতে হয় প্লটো তা পূরণ করতে না পারায় সে গ্রহের মর্যাদা হারায়। আজ সে একটি বামন গ্রহ। কিন্তু যেদিন এটি আবিষ্কৃত হয় সেদিন গ্রহ হিসেবে সারা পৃথিবীতে আলোড়ন তুলেছিল। অনেকটা পরিবারে নতুন সদস্য জন্ম নিলে যেমনটা হয়। সৌরজগতের এই নতুন গ্রহ প্লটো আবিষ্কৃত হওয়ার পরপরই এই গ্রহটি বিভিন্ন দেশের সংস্কৃতিতে অন্তর্ভুক্ত হয়ে যেতে থাকে। বিভিন্ন উপন্যাস, চলচ্চিত্রে চরিত্রের নামে, পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রের নামে, মৌলিক পদার্থের নামে কিংবা আরো নানাবিধ ক্ষেত্রে প্লটো যুক্ত হতে থাকে। তাই প্লটো কোন গ্রহ হউক আর না হউক আজো এর প্রতি মানুষের আবেগ এতটুকো কমেনি।

প্লটো (Pluto) আবিষ্কার

শিক্ষানবীশ জ্যোর্তিবিদ ক্লাইড টমবো ১৯৩০ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি সৌরজগতে একটা নূতন গ্রহের গতি শনাক্ত করেন। আরো কিছু পরীক্ষা শেষে নিশ্চিত হওয়ার পর এই নতুন আবিষ্কারটিকে হার্ভার্ড কলেজ অবজারভেটরিতে প্রেরণ করা হয়। আবিষ্কৃত হয় একটি নতুন গ্রহ। নতুন গ্রহটির আবিষ্কারে সারা পৃথিবীতে হইচই পড়ে যায় এবং  বড় বড় সংবাদ মাধ্যমের শিরোনাম হয়। হাজারেরও বেশি নামের প্রস্তাবনা শেষে তার নাম দেয়া হয় প্লটো (Pluto)।মজার ব্যাপার হলো প্লটোর নামকরণ করেছিলো ১১ বছর বয়সী এক মেয়ে। ১৯৩০ সালে, ইংল্যান্ডের অক্সফোর্ডের ভেনেশিয়া বার্নি তার দাদাকে সকালের নাস্তার টেবিলে প্রস্তাব দিয়েছিল যে নতুন আবিষ্কারের নামকরণ রোমান পাতালের দেবতার নামে করা হোক। তিনি নামটি লোয়েল অবজারভেটরিতে পাঠান এবং এটি নির্বাচিত হয়। প্লটো (Pluto) হচ্ছে গ্রিক পৌরাণিক কাহিনীর মৃতদের দেবতা এবং অন্ধকার জগতের শাসনকর্তা। প্লটো সূর্য থেকে এত দূরে যে তার কাছে আলো প্রায় পৌঁছায়ই না তাই এই নামকরণটাকে সবাই সঠিক বলেই মেনে নেয়।

যে কারণে প্লটো (Pluto) গ্রহ হতে পারলো না     

১৯৩০ সালে গ্রহটিকে খুঁজে পাবার পরে থেকেই সমস্যা জন্ম হতে শুরু করল। তার প্রধান কারণ নূতন খুঁজে পাওয়া গ্রহটি খুব ছোট। পৃথিবীর ৫ ভাগের এক ভাগ। তাছাড়া সৌরজগতের শেষ মাথায় প্লটোকে ছাড়িয়েও আরো দূরে একাধিক বস্তু পাওয়া যায় যাদের আকার প্লটো থেকেও বড়। যদি প্লটো গ্রহ হয়ে থাকে তাহলে তার থেকেও বড় একটা কিছু কেন গ্রহ হবে না? বিশেষ করে ২০০৫ সালে এরিস (Eris) নামে প্লটোর চেয়েও বড় একটি বস্তুকে তারই কক্ষপথে আবিষ্কারের পর গ্রহের সংজ্ঞা নিয়ে বিতর্ক শুরু হয়, যা প্লটোর গ্রহ মর্যাদা হারানোর অন্যতম কারণ।
এর বাইরে প্লটোকে নিয়ে সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে এর কক্ষপথ মোটেও গোলাকার নয়, সূর্য থেকে সবচেয়ে দূরে যখন থাকে তখন তার দূরত্ব ৪.৫ বিলিয়ন মাইল, যখন কাছে আসে তখন তার দূরত্ব ২.৭ বিলিয়ন মাইল। শুধু তাই নয়, এটা যখন সূর্যের কাছে আসে তখন সব নিয়ম ভঙ্গ করে নেপচুন গ্রহের কক্ষপথ ভেদ করে ভেতরে চলে আসে!
তাই জ্যোতির্বিদদের সংগঠন ইন্টারন্যাশনাল এস্ট্রোনমিক্যাল এসোসিয়েশান (IAU) ২০০৬ সালের একটা জরুরি সভায় প্লটোর ব্যাপারটা নিয়ে আলোচনা করতে বসে। সেই আলোচনায় তারা নতুন করে গ্রহ বলতে কী বোঝায় তার সংজ্ঞা তৈরি করেন। গ্রহের নতুন সংজ্ঞার মূল শর্তগুলো হলো:
১. সূর্যকে প্রদক্ষিণ করতে হবে।
২. নিজের মহাকর্ষ বলের কারণে গোলাকার আকৃতি ধারণ করতে হবে।
৩. নিজের কক্ষপথের অন্য বস্তুগুলোকে পরিষ্কার বা সরিয়ে দিতে হবে।
অর্থাৎ, সৌরজগতে শুধু সেই সব বস্তুকেই গ্রহ বলা হয় যেগুলো আলাদা আলাদাভাবে সূর্যকে ঘিরে ঘুরছে, যার আকার যথেষ্ট বড় যেন নিজেদের মাধ্যাকর্ষণ বলের কারণে গোলাকৃতি ধারণ করে এবং তার কক্ষপথে ঘোরার সময় তার আশেপাশের এলাকায় নিজের একটা প্রভাব ফেলতে পারে।

প্লটো এবং এর উপগ্রহ ক্যারন

প্লটো এবং এর উপগ্রহ ক্যারন

নতুন এই সংজ্ঞার কারণে ২০০৬ সালের ২৪ আগস্ট প্লটো তার গ্রহের মর্যাদা হারায় এবং গ্রহের সম্মান থেকে বঞ্চিত হয়। এটি সূর্যকে ঘিরে ঘুরে, তার আকৃতি গোলাকার কিন্তু এটি তার কক্ষপথে নিজের প্রভাব বা একচেটিয়া মহাকর্ষীয় নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে পারেনি। অন্যসব গ্রহ সূর্যকে ঘিরে ঘোরার সময় তার কক্ষপথের কাছাকাছি যত জঞ্জাল রয়েছে তার সবকিছু পরিষ্কার করে ফেলেছে। কিন্তু এই গ্রহটির কক্ষপথে রয়েছে অসংখ্য ছোট-বড় জঞ্জাল। প্লটোর কক্ষপথ কুইপার বেল্টের অসংখ্য বস্তুর সঙ্গে ভাগ করে। সে নিজের কক্ষপথের আশেপাশের অন্যান্য মহাজাগতিক বস্তুগুলোকে সরিয়ে দিতে পারেনি।যেমন- তুলনামূলকভাবে পৃথিবীর মতো গ্রহ তাদের কক্ষপথে ৯০ শতাংশের বেশি বস্তুকে আকর্ষণ বা বিতাড়িত করে নিজেদের মহাকর্ষীয় কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেছে। প্লটো সেই মাপকাঠিতে উত্তীর্ণ হতে পারেনি। তাই যে বস্তু নিজের কক্ষপথকে পরিষ্কার করতে পারে না তাকে গ্রহ বলতে সবার আপত্তি! এমনকি প্লটো সূর্যের চারপাশে ঘোরার সময় মাঝে-মধ্যে নেপচুনের কক্ষপথে ঢুকে পড়ে, আবার বেরিয়েও যায়। যা একটি স্বতন্ত্র গ্রহের বেলায় হবার নয়। এর ভরও অনেক কম। এর চেয়ে আরো ভর বিশিষ্ট বস্তুর উপস্থিতি আমাদের সৌরজগতে অবস্থান করছে।
তাই সূর্যের চারপাশে ঘোরা, গোলাকার আকৃতি এবং নিজস্ব চাঁদ থাকার পরও গ্রহের প্রথম দুটি শর্ত পূরণ করে তৃতীয় শর্ত, অর্থাৎ শক্তিশালী কক্ষপথ অনুসরণ না করা এবং কক্ষপথে নিজের পূর্ণ প্রভাব না থাকায় প্লটো গ্রহের মর্যাদা হারায়। পরবর্তীতে প্লটোকে ‘বামন গ্রহ’ (dwarf planet) হিসেবে বিবেচনা করা হতে থাকে। সৌরজগতে এরকম বামন গ্রহ আরো ৪৪টি রয়েছে!

প্লটো (Pluto) নিয়ে আরো তথ্য 

⇒ প্লটো পৃথিবী থেকে সূর্যের চেয়ে প্রায় ৩৯ গুণ দূরে অবস্থিত। সূর্য থেকে এর গড় দূরত্ব প্রায় ৫৯০ কোটি কিলোমিটার। এই দূরত্বে সূর্য থেকে প্লটোতে সূর্যের আলোর পৌঁছাতে ৫.৫ ঘন্টা সময় লাগে।
⇒ প্লটো মাত্র ১,৪০০ মাইল প্রশস্ত। এই ছোট আকারের প্লটো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্থের মাত্র অর্ধেক।
⇒ এর ব্যাস প্রায় ৬,০০০ কিলোমিটার। এটি এখন সৌরজগতের দ্বিতীয় বৃহত্তম বামন গ্রহ হিসেবে স্বীকৃত যার অবস্থান কুইপার বেল্টে।
⇒ গড়ে, প্লটোর তাপমাত্রা -৩৮৭°F (-২৩২°C), যা প্রাণের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার জন্য অত্যন্ত ঠান্ডা। তাই সেখানে জীবনের অস্তিত্ব থাকার সম্ভাবনা কম। এর বায়ুমণ্ডলের বেশিরভাগই নাইট্রোজেন, মিথেন এবং কার্বন মনোক্সাইড দিয়ে তৈরি।
⇒ প্লটোতে একদিন হতে প্রায় ১৫৩ ঘন্টা সময় লাগে। সূর্যের চারিদিকে একবার প্রদক্ষিণ করতে এর সময় প্রয়োজন হয় ২৮৪ বছর।
⇒ প্লটোর পাঁচটি পরিচিত চাঁদ বা উপগ্রহ রয়েছে: ক্যারন, নিক্স, হাইড্রা, কারবেরোস এবং স্টাইক্স। যার মধ্যে ক্যারনের আকার প্লটোর আকারের প্রায় অর্ধেক।

 

তথ্য সূত্র :
https://science.nasa.gov/dwarf-planets/pluto/
https://en.wikipedia.org/wiki/Pluto

ছবি ক্রেডিট:
https://commons.wikimedia.org/

Sharing is caring!

Shajahan Manik

ইংরেজি প্রভাষক শাহ্জাহান মানিক একাধারে কবি, লেখক, গবেষক ও অনুবাদক। একাধিক কাব্যগ্রন্থ ছাড়াও তার অনুদিত বইয়ের সংখ্যা ১০টি। এছাড়া সায়েন্স ফিকশন, সম্পাদনা, ছোটদের বইয়ের পাশাপাশি তার রয়েছে ইংরেজি শেখার বই। তার সর্বশেষ প্রকাশিত গ্রন্থ হচ্ছে- মানব কল্যাণে মুসলিম বিজ্ঞানীদের অবদান।

https://besorgo.com

1 thought on “প্লটো (Pluto) কেন গ্রহ হতে পারলো না ! 

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।